সংকলনে : ডা. এ.বি সিদ্দিক
অন্তরের রোগ সমূহ থেকে নিজেকে মুক্ত করার নামই হল ইসলাহুন নফস বা আত্মশুদ্ধি। আর অন্তরের রোগ সমূহ থেকে কয়েকটি রোগ সম্পর্কে আমরা গত পর্বে জেনেছিলাম। সেগুলো হলো, ১। সত্যকে অপছন্দ করা ২। ইবাদতের বেলায় মনের অবাস্তব আকাঙ্খা ৩। কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করা ৪। অন্তরে মন্দ চিন্তা-ভাবনাকে প্রশ্রয় দেওয়া ৫। দ্বীনি ইলম বা জ্ঞানের মাধ্যমে দুনিয়া তালাশ করা ৬। অন্যের দোষ তালাশ করা ৭। নিজেকে নিরাপদ মনে করা। ৮। হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ করা। ৯। কৃপণতা করা। ১০। লোভের শিকার হওয়া। ১১। সর্বদা অতিমাত্রায় আনন্দিত ও খুশিতে থাকা। আর এ পর্বেও আমরা আরো কয়েকটি রোগ সম্পর্কে জানব ইনশাআল্লাহ। আর তা হলো:
১২। রিয়া বা লৌকিকতা প্রদর্শন করা। মানুষের মনের অন্যতম একটি রোগ হলো ইবাদত বন্দেগিতে রিয়া বা লৌকিকতা প্রদর্শন করা। আর এমনটি করার কারণ হলো যাতে করে অন্যরা তার ইবাদত-বন্দেগির কথা জানতে পারে এবং কাজ কর্মগুলো প্রত্যক্ষ করে। মানুষ তার প্রশংসা করে। চারদিকে তার সুনাম যেন ছড়িয়ে পরে। এক কথায়, মানুষের কাছে তার একটা অবস্থান তৈরি করার জন্য ইবাদত বন্দেগিতে সে রিয়া বা লৌকিকতা প্রদর্শন করে থাকে। এটি মারাত্মক একটি অন্যায়। মনের ভেতর থেকে এমন মনোভাব দুর করতে হবে। আর এই জন্য নিজের আমল ও ইবাদতগুলোতে ইখলাছ আনয়নের চেষ্টা করতে হবে। কেননা আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলেছেন, তাদেরকে কেবল এই বিষয়ের আদেশ করা হয়েছে যে, তারা দ্বীনকে একনিষ্ট করে আল্লাহর ইবাদত করবে। (সূরা বাইয়্যিনাহ: ৫)
একটি হাদীসে কুদসীতে এসেছে, আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলেন, যে ব্যক্তি আমার জন্য এমন কোন আমল করল, যাতে সে অন্য কাউকে আমার সাথে শরীক করল তাহলে আমি তার থেকে মুক্ত, সে কাজ তার জন্য যাকে সে শরীক করেছে। (ইবনে মাজাহ: ৪২০২)
১৩। অহংকার করা। অহংকার মানুষের অন্তরের জন্য খুবই ক্ষতিকর একটি রোগ, যা একজন মানুষের নৈতিক চরিত্রকে কলুষিত করার পাশাপাশি তাকে হিদায়াত ও সত্যের পথ থেকে দূরে সরিয়ে ভ্রষ্টতা ও গোমরাহির পথের দিকে নিয়ে যায়। অহংকারের কারণেই মানুষ সত্যকে অস্বীকার করে। আর এই কারণেই রাসূল (সা.) অহংকারের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে একটি হাদীসে বলেছেন, যে ব্যক্তির অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। (এ কথা শুনে) এক ব্যক্তি বলল, কোনো কোনো লোক এমন আছে, যে নিজের কাপড়-চোপড় ও জুতা-স্যান্ডেল সুন্দর ও উত্তম হওয়াকে পছন্দ করে। (এটাও কি অহংকারের মধ্যে গণ্য হবে?)। তিনি বললেন, নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা সুন্দর। তিনি সৌন্দর্যকে পছন্দ করেন। অহংকার হলো হকের প্রতি ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করা (অর্থাৎ হককে তুচ্ছ মনে করে অস্বীকার করা এবং বড়ত্ব ও দাম্ভিকতা দেখিয়ে হক কবুল করা হতে বিরত থাকা) এবং মানুষকে অবজ্ঞা করা। (মুসলিম: ১৬৬)
উল্লেখিত হাদীস থেকে অহংকারের পরিচয় স্পষ্ট হয়ে যায়। পাশাপাশি এটাও স্পষ্ট হয়ে গেল যে, কারো হৃদয়ে অহংকার থাকলে সে জান্নাতে যেতে পারবে না। কাজেই কারো মনে অহংকার থাকলে তাকে অবশ্যই এই রোগ থেকে বের হয়ে আসতে হবে। তাকে নিজের দূর্বলতার প্রতি দৃষ্টি দিতে হবে। তাকে সব সময় মনে রাখতে হবে যে, আজকে যে বিষয় নিয়ে সে অহংকার করতেছে কালকে সেটা তার অধীনে নাও থাকতে পারে। মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীন চাইলে মুহুর্তের মধ্যেই তার অহংকারের জিনিসগুলোকে ধ্বংস করে দিতে পারেন। এই ভাবে অহংকারের উল্টা চিন্তা করে ভেতর থেকে সকল ধরণের অহংকারকে বের করে দিতে হবে।
১৪। অন্যের ব্যপারে খারাপ ধারণা পোষণ করা। মনের অন্যতম আরেকটি রোগ হলো কারো ব্যপারে খারাপ ধারণা পোষণ করা। কেননা অধিকাংশ ধারণাই পাপ। এতে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়, সুসম্পর্ক বিনষ্ট হয় এবং যার সম্পর্কে খারাপ ধারণা করা হয় তাকে নিয়ে গীবত ও নিন্দা করা হয়। আর এসব কিছুই পরস্পরের মধ্যে শত্রুতার সৃষ্টি করে যার ফলে সমাজে অশান্তি সৃষ্টি হয়। তাই আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলেন, হে মুমিনগণ! তোমরা অধিক অনুমান বা ধারণা থেকে দুরে থাক। নিশ্চয় কোন কোন ধারণা তো পাপ। (সূরা হুজুরাত: ১২)
রাসূল (সা.) বলেন, তোমরা ধারণা করা হতে বেঁচে থাক, কারণ ধারণা করা হল সবচেয়ে বড় মিথ্যা। (বুখারী: ৬৭২৪)
কাজেই অন্যের ব্যপারে খারাপ ধারণা পোষণ করা হতে সবাইকে বেঁচে থাকতে হবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাওফীক দিন। আমীন
প্রচারে : আসুন কুরআন পড়ি, সফল জীবন গড়ি।
আল-শেফা জেনারেল হাসপাতাল (প্রা.), ভৈরব।
![]()