নিজস্ব প্রতিনিধি:- কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার আগানগর জিল্লুর রহমান স্কুল অ্যান্ড কলেজের কম্পিউটার ল্যাব অপারেটর আরফান আকাশ। যাকে এলাকাবাসী ও শিক্ষার্থীরা আকাশ মাস্টার নামেই চেনে। ওই ল্যাব অপারেটরের বিরুদ্ধে স্কুলের একাধিক ছাত্রী নিপীড়নের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। প্রেমের ফাঁদে ফেলে একাধিক ছাত্রীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়ানোসহ এক ছাত্রী আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়ার মতো ভয়াবহ ঘটনায় আকাশ মাস্টারের নাম জড়িয়ে পড়েছে। এসব ঘটনায় পুরো এলাকায় তোলপাড় সৃষ্টি হলেও স্কুল কর্তৃপক্ষের নীরব ভূমিকায় জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানাযায়, প্রায় তিন বছর আগে জিল্লুর রহমান স্কুল অ্যান্ড কলেজের কম্পিউটার ল্যাব অপারেটর হিসেবে যোগদান করেন আরফান আকাশ। যোগদানের কিছুদিন পর থেকেই তিনি প্রধান শিক্ষক তাপস বিশ্বাসের অনুগত হওয়ায় স্কুলে তিনি প্রভাব বিস্তার করতে থাকেন।
অভিযোগ রয়েছে, প্রধান শিক্ষকের অনুমতি পেয়ে তিনি নিয়মবহির্ভূতভাবে বিভিন্ন ক্লাসে পাঠদান শুরু করেন। এই সুযোগেই বেশ কয়েকজন ছাত্রীকে প্রভাবিত করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ওই ল্যাব অপারেটর আকাশ সপ্তম শ্রেণী ও অষ্টম শ্রেণির ক্লাস করাতেন। আর এই ক্লাস নেয়ার সুবাদেই একাধিক ছাত্রীকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন তিনি। অন্য শিক্ষকের বদলি ক্লাস নেওয়ার কথা স্বীকার করলেও ছাত্রীদের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িত নন বলে দাবি করেন আকাশ মাস্টার। অভিযুক্ত ল্যাব অপারেটর আরফান আকাশ উরফে আকাশ মাস্টার, তিনি উপজেলার শ্রীনগর গ্রামের মুছা মিয়ার ছেলে।
অপরদিকে, প্রধান শিক্ষকের কাছে অভিযুক্ত আকাশের বিরুদ্ধে একাধিক অভিভাবক ছাত্রীদের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক ও বিরক্ত করার ঘটনা বিষয়ে মৌখিক অভিযোগ জানালে আকাশ মাস্টারকে ক্লাস না করার জন্য নিষেধ করেন প্রধান শিক্ষক তাপস বিশ্বাস। মৌখিকভাবে তাকে সতর্ক করলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেননি বলে অভিযোগ স্কুল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে।
ছাত্রীদের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কের এমন আরেকটি ঘটনা উপজেলা নির্বাহী অফিসার শবনম শারমিনকেও ভূক্তভোগী এক ছাত্রীর অভিভাবক অভিযোগ করেছেন বলে জানান ইউএনও। তিনি বলেন, মানসম্মানের কথা চিন্তা করে ভুক্তভোগীরা ওই ঘটনাটি চেপে গেছে, না হলে সামাজিকভাবে সমাধান করেছেন হয়ত। এসব ঘটনার বিচার না হওয়ায় সাধারণ অভিভাবকরা তাদের সন্তানদেরকে ওই স্কুল থেকে অন্য স্কুলে নিয়ে ভর্তি করায় দিনদিন ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা কমছে। এনিয়ে স্কুলের শিক্ষক ও স্থানীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে।
এতদিন ধামাচাপা থাকলেও লুন্দিয়া গ্রামের ভূক্তভোগী ছাত্রীর আত্নহত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে জনসম্মুখে বেরিয়ে আসে একাধিক ছাত্রীর সঙ্গে আকাশ মাস্টারের অনৈতিক সম্পর্কের ঘটনা গুলো।
উপজেলার আগানগর ইউনিয়নের লুন্দিয়া গ্রামের বাসিন্দা অষ্টম শ্রেণির ছাত্রীর সঙ্গে অভিযুক্ত আকাশ মাস্টারের সম্পর্ক অনৈতিক পর্যায়ে পৌঁছায় বলে অভিযোগ উঠে। ওই ছাত্রীকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে ও বিয়ের আশ্বাস দিয়ে সম্পর্কে জড়ানোর একপর্যায়ে পরিবারের পক্ষ থেকে ২২সেপ্টেম্বর, সোমবার অন্যত্র বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করেন আকাশ মাস্টারের। এবিষয়টি মেনে নিতে পারেনি লুন্দিয়া গ্রামের ওই ভুক্তভোগী ছাত্রী। সে প্রতারণার শিকার হয়ে হতাশ হয়ে পড়েন এবং গত ১৩সেপ্টেম্বর, শনিবার ওই ছাত্রী ইঁদুর মারার ঔষধ খেয়ে আত্মহননের পথ বেছে নেয়। পরে স্বজনরা তাকে ভাগুলপুর জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন এবং পুলিশকে বিষয়টি অবগত করেন। বাজিতপুর থানা পুলিশ এসে মৃতদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য কিশোরগঞ্জ মর্গে পাঠান। এঘটনায় একটি প্রভাবশালী মহল পরিবারটিকে নানা চাপে রাখায় তারা মামলা করতে যায়নি। তবে এঘটনার অভিযুক্তের বিচার দাবি করেছেন ভুক্তভোগী পরিবারের লোকজন।
এরপরও থেমে থাকেননি আকাশ মাস্টার। তার অনৈতিক কর্মকাণ্ড গুলো তার নেশায় পরিনত হয়েছে বলে জানান নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক। স্থানীয় এলাকাবাসী ও স্কুলের কয়েকজন শিক্ষক আরও অভিযোগ করে বলেন, জগমোহনপুর গ্রামের অষ্টম শ্রেণির এক ছাত্রীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়ায় আকাশ, পরে ওই ছাত্রীর অভিভাবক লেখাপড়া বন্ধ করে দিয়ে দুই মাস আগে অন্যত্র বিয়ে দেন। লুন্দিয়ার ছাত্রীর মৃত্যুর ঘটনার পরও গত ২৮সেপ্টেম্বর, রবিবার দিনগত রাত আনুমানিক ১২টার দিকে স্কুল সংলগ্ন ওই বিবাহিত ছাত্রীর বাড়িতে দেখা করতে গেলে স্থানীয়রা তাকে আটক করে উত্তমমধ্যম দেয় এবং অভিযুক্ত আকাশের পরিবারকে খবর দিয়ে এনে তাদের জিম্মায় দেন। মানসম্মানের ভয়ে পরিবারের লোকজন মুখ খুলতে চাচ্ছেনা। তবে সবগুলো ঘটনাই অভিভাবক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, স্থানীয় মানুষজনসহ স্কুল কর্তৃপক্ষ অবগত আছে। ভূক্তভোগীরা মৌখিক অভিযোগ দিলেও লিখিত অভিযোগ না দেয়ার কারণেই স্কুল কর্তৃপক্ষ বিষয়গুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো: কুদ্দুস মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আকাশের মতো মানুষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে থাকলে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস হবে। তার মতো অসাধু ব্যক্তি স্কুলে থাকলে প্রতিষ্ঠানের সুনাম নষ্ট হবে। এতগুলো ঘটনা ঘটলেও তার বিরুদ্ধে কোন আইনি পদক্ষেপ না নেয়ায় দিনদিন আকাশ মাস্টারের অপকর্ম বেড়েই চলছে। কোমলমতি ছাত্রী ও স্কুলটিকে বাঁচাতে দ্রুত তদন্ত করে আকাশকে বরখাস্ত করে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার দাবি করেন স্কুল কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের নিকট।
এলাকাবাসী দাবি তুলেছেন, আকাশ মাস্টারকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ স্বাভাবিক রাখা হোক, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো শিক্ষার্থী এভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
নিহত ছাত্রীর বাবা সিরাজুল ইসলাম বলেন, তার মেয়ে বাসায় অভিযোগ করেছে আকাশ মাস্টার তাকে কুপ্রস্তাব দিতো ও বিরক্ত করতো। পরে স্কুল কমিটির মেম্বার আক্কাছ মিয়ার মাধ্যমে প্রধান শিক্ষকের কাছে মৌখিক অভিযোগ করি মেয়ে মারা যাওয়ার ১৫দিন আগে। তখন কোন বিচার হয়নি তার। তাছাড়া মেয়ের বান্ধবী জ্যোতি নামে এক ছাত্রীকে দিয়ে বাসায় প্রস্তাব পাঠিয়েছে আকাশ মাস্টার। জ্যোতির সহযোগিতায় আকাশ মাস্টার বিভিন্ন অপকর্মে জড়িত হচ্ছে। মেয়ে মারা গেছে, আর অভিযোগ দিয়ে কি করুম, আল্লাহ কাছে বিচার দিলাম।
এবিষয়ে আকাশ মাস্টারের সহযোগী এক শিক্ষার্থী জ্যোতি বলেন, অন্য একজন মেয়ের সাথে আকাশ স্যারের সম্পর্ক ছিলো শুনেছি। আর তার বান্ধবী বৃত্তি দিবে বলে আকাশ স্যার তাকে প্রেসারে রাখতেন এবং নিয়মিত খোঁজ খবর রাখতো।
এদিকে স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সদস্য মো: আক্কাছ মিয়া বলেন, আগানগর, জগমোহনপুর, রাধানগর, লুন্দিয়ার অনেক গার্ডিয়ান আকাশ মাস্টারের বিরুদ্ধে মৌখিক অভিযোগ করেছেন। লিখিতভাবে অভিযোগ না করায় কোন ব্যবস্থা নেয়া যায়নি। অন্যদিকে অষ্টম শ্রেণির এক ছাত্রীর ঘটনায় ২৮সেপ্টেম্বর রাতে তার বাড়ির লোকজন আকাশ মাস্টারকে আটক করে মারধর এবং পরিবারের জিম্মায় দেয়ার ঘটনা ঘটেনি বলে তিনি দাবি করেন।
অভিযুক্ত কম্পিউটার ল্যাব অপারেটর আকাশ মাস্টার বলেন, পিছনে মানুষ অনেক কথা বলে, আসলে কিছু হয়নি। এমন ধরনের কোন ঘটনাই ঘটেনি। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ গুলো মিথ্যা বলে দাবি করেন। কোন ছাত্রীর সঙ্গে প্রেমের কোন সম্পর্ক হয়নি তার। শুধু ছাত্রী হিসেবেই তাদেরকে চিনেন তিনি।
জিল্লুর রহমান স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রধান শিক্ষক তাপস বিশ্বাস বলেন, আকাশ মনোযোগ দিয়ে পাড়ায় বলে তাকে ক্লাস করার অনুমতি দেয়া হয়। আকাশের বিরুদ্ধে মৌখিক অভিযোগ করেছে অনেক অভিভাবক। তাদের অভিযোগ পেয়ে আকাশকে ক্লাস নেয়া বন্ধ করে দেয়া হয়। লিখিত অভিযোগ না থাকায় ব্যবস্থা নেয়া যায়নি। তবে আকাশের অভিভাবককে বলা হয়েছে তাকে দ্রুত বিয়ে করানোর জন্য। ভুক্তভোগী পরিবার যদি আকাশের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করে সেখানে আমাদের পক্ষ থেকে কোন বাধা থাকবেনা।
এবিষয়ে ভৈরব উপজেলা নির্বাহী অফিসার শবনম শারমিন বলেন, স্কুলের ছাত্রীর সঙ্গে নারী ঘটিত একটি ঘটনা নিয়ে ভূক্তভোগী এক ছাত্রীর অভিভাবক মৌখিক অভিযোগ করেছিলো আকাশের বিরুদ্ধে। মানসম্মানের কথা চিন্তা করে হয়তো তারা ওই ঘটনাটি চেপে গেছে, না হয় সামাজিকভাবে সমাধান করেছে হয়ত। আকাশ মাস্টারের বিষয়ে স্কুলের প্রধান শিক্ষক কিংবা ভুক্তভোগীদের কেউ লিখিত অভিযোগ করেননি। একজন ভুক্তভোগীও যদি লিখিত অভিযোগ করে, তখন তদন্তপূর্বক আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে।
![]()