নিজস্ব প্রতিবেদক | ব্রাহ্মণবাড়িয়া
নিজের সন্তানের বাবার পরিচয় নেই, নেই মাথার ওপর কোনো নিরাপদ ছাদ। তবুও মায়ের কোলই যেন পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। অনিশ্চয়তা, দারিদ্র্য আর চরম জীবনসংগ্রামের মাঝেই পৃথিবীর আলো দেখলো এক নবজাতক শিশু। আর জন্মের পর তার ঠিকানা হলো ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া রেলস্টেশনের ১ নম্বর প্লাটফর্মের ওভারব্রিজের নিচে।
গত সোমবার (২৫ মে) বিকেলে অসীম মাতৃত্বের টান আর এক বুক ভালোবাসা নিয়ে নিজের ফুটফুটে সন্তানকে বুকে জড়িয়ে এই আশ্রয়ে ফিরে আসেন অসহায় মা মাহমুদা আক্তার রুপা (২০)। জীবনের সিংহভাগ সময় যেখানে ভবঘুরে ও ভাসমান অবস্থায় কাটিয়েছেন, সেখানেই শুরু হলো তার সন্তানের নতুন জীবনযুদ্ধ।
জানা যায়, কুমিল্লার বরুড়া উপজেলায় জন্ম হলেও ছোটবেলা থেকেই আখাউড়া রেলস্টেশন এলাকায় বেড়ে ওঠেন রুপা। সেখানে সাব্বির নামের এক যুবকের সাথে সম্পর্কের জেরে তিনি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন। কিন্তু গর্ভধারণের পরই পাল্টে যায় পরিস্থিতি। সন্তানকে নিজের বলে স্বীকার না করে রুপাকে একা ফেলে পালিয়ে যায় ওই যুবক। সমাজের নিষ্ঠুর বাস্তবতায় যখন রুপা পুরোপুরি অসহায়, তখন গত ২১ মে প্রসববেদনা নিয়ে তিনি ভর্তি হন ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে।
হাসপাতালে যখন যন্ত্রণায় ছটফট করছিলেন রুপা, তখন তার পাশে দেবদূতের মতো এগিয়ে আসেন হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স এবং মানবিক সংগঠন ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর’। গত ২২ মে ভোররাতে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে জন্ম নেয় এক সুস্থ ছেলে শিশু।
হাসপাতাল থেকে বিদায়ের সময় ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর’-এর পক্ষ থেকে নবজাতকের জন্য মশারি, পোশাক, প্যাম্পাস, বিছানাপত্র ও প্রসাধনসহ যাবতীয় শিশুসামগ্রী তুলে দেওয়া হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও বাতিঘরের যৌথ উদ্যোগে নিশ্চিত করা হয় রুপার প্রয়োজনীয় সব ওষুধ ও খাবার।
রুপার এই অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে স্থানীয় এক নারী চিকিৎসার জন্য সংগৃহীত অর্থের একটি অংশ আত্মসাৎ করে তাকে হাসপাতালেই ফেলে চলে যায়। তবে এমন অমানবিকতার মাঝেও দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় প্রশাসন এবং বাতিঘর সংগঠনটি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মোঃ আজহার উদ্দিন জানান, মানবিক দায়িত্ববোধ থেকেই তারা রুপা ও তার সন্তানের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং ভবিষ্যতেও এই সহায়তা অব্যাহত থাকবে। একই আশ্বাস দিয়েছেন সদর মডেল থানা ও আখাউড়া রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাও।
তীব্র অভাব, অবহেলা আর অনিশ্চয়তা থাকা সত্ত্বেও নিজের সন্তানকে কারো হাতে তুলে দিতে রাজি নন রুপা। সব প্রতিকূলতা জয় করে সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করার এক দৃঢ় প্রত্যয় তার চোখে-মুখে।
আজ এই নবজাতকের পরিচয়ে হয়তো বাবার নাম নেই, কিন্তু আছে মায়ের অকুণ্ঠ ভালোবাসা আর সংগ্রামের এক জীবন্ত ইতিহাস। সমাজের সব অবহেলা ও অন্যায়ের মুখে দাঁড়িয়ে এই অসহায় মা প্রমাণ করে দিয়েছেন—পৃথিবীতে আর যাই হোক, মাতৃত্ব কখনো হেরে যায় না।
![]()