ভৈরবে অডিও ফাঁস, মাদকবিরোধী কার্যক্রম ও জলাশয় ভরাট ইস্যুতে তোলপাড়
নিরপেক্ষ তদন্ত ও সত্য উদঘাটনের দাবি সচেতন মহলের
শাহিন আলম, ভৈরব (কিশোরগঞ্জ):
কিশোরগঞ্জের ভৈরব পৌর শহরের ৩নং ওয়ার্ডকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি একটি কথিত ফোনালাপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর রাজনৈতিক, সামাজিক ও জনপরিসরে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে মাদকবিরোধী কার্যক্রম, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং জলাশয় ভরাটের ঘটনাকে ঘিরেও উত্তেজনা ও বিতর্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত অডিওতে ভৈরব পৌর ৩নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ও মাদকবিরোধী সংগঠন “আমাদের চেষ্টা”-এর সভাপতি ওমর মোহাম্মদ অপুর কণ্ঠ রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। অডিওতে সম্পত্তি বিক্রি সংক্রান্ত একটি বিষয়ে অর্থ লেনদেনের আলোচনা রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে অডিওটির সত্যতা কিংবা এতে থাকা বক্তব্যের বাস্তবতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অডিওটি প্রকাশের পর এলাকাজুড়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন, আবার কেউ এটিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা বলেও দাবি করেছেন। এখন পর্যন্ত কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি।
এদিকে, ভৈরবে দীর্ঘদিন ধরে মাদকবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনাকারী সংগঠন “আমাদের চেষ্টা”কে ঘিরেও নানা অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ সামনে এসেছে। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ইউসুফ মিয়ার বিরুদ্ধে যেমন বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে, তেমনি ইউসুফ মিয়াও অতীতে সংগঠনের সভাপতি ওমর মোহাম্মদ অপুসহ কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযানের নামে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তুলেছিলেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়। তবে এসব অভিযোগের কোনোটি এখন পর্যন্ত প্রমাণিত হয়নি।
অন্যদিকে, জনসেবা সঞ্চয় ঋণদান সমবায় সমিতির সভাপতি ফারুক আহমেদের ফেসবুক আইডি থেকে দেওয়া একটি পোস্ট নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ওই পোস্টে তিনি দাবি করেন, এলাকায় মাদকবিরোধী কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকে একটি চক্র তাদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। পরে এক মন্তব্যে তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ফোনালাপ সম্পাদনা (এডিট) করে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
ফারুক আহমেদ আরও দাবি করেন, মাদক নির্মূলে তিনি ও তার সহযোগীরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। কোনো মাদক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে অর্থ গ্রহণের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তিনি এলাকাবাসীর যেকোনো সিদ্ধান্ত মেনে নেবেন বলেও উল্লেখ করেন।
এদিকে ভৈরব পৌর শহরের পঞ্চবটী কাটেরপুল এলাকায় একটি জলাশয় ভরাটের উদ্যোগ নিয়েও ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বালুভরাটের মাধ্যমে জলাশয়ের একটি অংশ ভরাটের চেষ্টা করা হচ্ছিল। বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনের নজরে আনা হলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কে এম মামুনুর রশীদের নির্দেশে ড্রেজার অপসারণ করা হয় বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
স্থানীয় পরিবেশ সচেতন নাগরিক ও সাবেক জনপ্রতিনিধিদের দাবি, শুধু ড্রেজার অপসারণ নয়, জলাশয় রক্ষায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের কর্মকাণ্ড রোধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
এ বিষয়ে ভৈরব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কে এম মামুনুর রশীদ বলেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত বিভিন্ন অভিযোগ এবং জলাশয় ভরাট সংক্রান্ত বিষয় প্রশাসনের নজরে এসেছে। কোনো অভিযোগের সত্যতা যাচাই ছাড়া প্রশাসন কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছায় না। পরিবেশ, জলাশয় ও সরকারি বিধি-বিধান সম্পর্কিত কোনো অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তিনি আরও বলেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত তথ্য যাচাই-বাছাই না করে বিভ্রান্তি ছড়ানো থেকে বিরত থাকা এবং দায়িত্বশীল আচরণ করা সবার কর্তব্য।”
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, অডিও ফাঁসের ঘটনা, মাদকবিরোধী কার্যক্রমকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ এবং জলাশয় ভরাটের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি দূর করতে প্রশাসনের নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। একই সঙ্গে সত্য উদঘাটন করে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবি জানিয়েছেন তারা।
![]()