শাহিন আলম। ভৈরব, কিশোরগঞ্জ
কিশোরগঞ্জের ভৈরবে দ্বিতীয় বিয়ের তথ্য গোপন করে মৃত স্বামীর সরকারি পেনশনের টাকা উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে সরকারি মহিলা কলেজের অফিস সহায়ক আফসানা বেগমের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় তার দ্বিতীয় স্বামী হিসেবে পরিচিত সাগর আহমেদ উজ্জ্বলের সঙ্গে যোগসাজশে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ করেছেন মৃত স্বামীর পরিবারের সদস্যরা।
অভিযুক্ত আফসানা বেগম ভৈরব সরকারি মহিলা কলেজের সাবেক অফিস সহায়ক মৃত আসাদ মিয়ার স্ত্রী। অভিযোগ রয়েছে, প্রথম স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করলেও তা গোপন রেখে বিধবা হিসেবে স্বামীর পেনশনের টাকা উত্তোলন করেছেন।
তবে আফসানা বেগম দ্বিতীয় বিয়ের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। অন্যদিকে সাগর আহমেদ দাবি করেছেন, আফসানা তার স্ত্রী এবং পেনশনের টাকা উত্তোলনের সুবিধার্থে বিয়ের বিষয়টি গোপন রাখতে তাকে অনুরোধ করা হয়েছিল।
মৃত আসাদ মিয়ার ভাই ও অভিযোগকারী কাউসার মাহমুদ বলেন, “আমার ভাই সরকারি মহিলা কলেজে অফিস সহায়কের চাকরি করতেন। ভাইয়ের মৃত্যুর পর আমার ভাবি আফসানা বেগম আরেকটি বিয়ে করেছেন। বিয়ের পর তিনি আমাদের না জানিয়ে ভাইয়ের প্রাপ্য পেনশনের টাকা উত্তোলন করে নিয়ে গেছেন। আমাদের কিছু না জানিয়ে ভাবি টাকা আত্মসাৎ করেছেন।”
তিনি আরও বলেন, “আমার মা অসুস্থ, অথচ ভাইয়ের পেনশনের এক টাকাও আমার মাকে দেওয়া হয়নি। ভাইয়ের মৃত্যুর পর ভাবি দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। বিয়ের তথ্য গোপন করে দ্বিতীয় স্বামীর সঙ্গে যোগসাজশে টাকা উত্তোলন করা হয়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী দ্বিতীয় বিয়ে হলে এভাবে পেনশনের টাকা উত্তোলন করা যায় না। আমি চাই বিষয়টি তদন্ত করা হোক এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে সরকারি কোষাগারে টাকা ফেরত নেওয়া হোক।”
তিনি আরও বলেন, “আমার সাদিয়া নামে একটি ভাতিজি রয়েছে। তার ভবিষ্যৎ নিয়েও আমরা চিন্তিত।”
জানা যায়, ২০২২ সালের ৮ জানুয়ারি মারা যান সরকারি মহিলা কলেজের অফিস সহায়ক আসাদ মিয়া। তার স্ত্রী আফসানা বেগমও একই প্রতিষ্ঠানে অফিস সহায়ক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাদের সংসারে সাদিয়া নামে একটি কন্যাসন্তান রয়েছে।
স্বামীর মৃত্যুর পর বিধবা স্ত্রী হিসেবে প্রাপ্য পেনশনের অর্থ উত্তোলন করেন আফসানা বেগম। তবে অভিযোগ রয়েছে, প্রথম স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি গোপনে সাগর আহমেদ নামের এক যুবককে বিয়ে করেন।
স্থানীয়ভাবে সাগর আহমেদ উজ্জ্বল যুবলীগ নেতা হিসেবে পরিচিত বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হলেও স্থানীয় যুবলীগ নেতারা জানান, তিনি সংগঠনের কোনো পদে নেই। তাদের দাবি, ব্যক্তি সাগরের কর্মকাণ্ডের দায় সংগঠন নেবে না এবং এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে যুবলীগের নাম ব্যবহার করে সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা উচিত নয়।
অভিযোগের বিষয়ে আফসানা বেগম বলেন, “আমার কারও সঙ্গে বিয়ে হয়নি। আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।”
তবে সাগর আহমেদ বলেন, “আফসানা আমার স্ত্রী। সে আমাকে বিয়ের বিষয়টি গোপন রাখতে বলেছিল। গোপন না রাখলে নাকি আগের স্বামীর পেনশনের টাকা উত্তোলন করতে পারবে না।”
এদিকে আফসানা বেগমের ভাই উজ্জ্বল মিয়া দাবি করেন, “সাগর আমার বোনকে ব্ল্যাকমেইল করে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। আমরা দ্রুত সময়ের মধ্যে সাগরের কাছ থেকে আমার বোনকে ডিভোর্স করাব।”
এ বিষয়ে ভৈরব সরকারি মহিলা কলেজের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা ইকবাল হোসেন বলেন, “আসাদের স্ত্রী তার স্বামীর মৃত্যুর পর নিয়মানুযায়ী টাকা উত্তোলন করেছেন। তার দ্বিতীয় বিয়ের কথা আমাদের জানা ছিল না। নিয়ম রয়েছে, দ্বিতীয় বিয়ে হলে তিনি পেনশনের টাকা উত্তোলন করতে পারবেন না। এ বিষয়ে আলাদা সরকারি বিধান রয়েছে।”
এ বিষয়ে ভৈরব সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ মোঃ মজিবুর রহমান বলেন, “উক্ত বিষয়ে আমাদের জানা নেই। আমি আগামীকাল রবিবার অফিসে গিয়ে বিষয়টি তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।”
তিনি আরও বলেন, “দ্বিতীয় বিয়ে হলে পেনশন ভাতা নিতে পারেন না। এখন যদি আসাদের পরিবারের পক্ষ থেকে কেউ মামলা করেন, তাহলে আদালত উক্ত বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।”
অভিযোগের সত্যতা, দ্বিতীয় বিয়ের তথ্য গোপন করে পেনশনের টাকা উত্তোলনে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না এবং সরকারি বিধি-বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না—তা তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ ঘটনায় মৃত আসাদ মিয়ার পরিবারের পক্ষ থেকে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে।
![]()